বাংলাদেশের রেলওয়ে ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো একতা এক্সপ্রেস। এই ট্রেনটি ঢাকা থেকে পঞ্চগড় পর্যন্ত যাতায়াত করে, যা উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য এবং আরামদায়ক পরিবহন মাধ্যম। এই ট্রেনটি আন্তঃনগর সার্ভিস হিসেবে পরিচিত, এবং এর আধুনিক সুবিধা ও নির্দিষ্ট সময়সূচী যাত্রীদের কাছে জনপ্রিয়। এই আর্টিকেলে আমরা একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী, রুট, টিকেট মূল্য, সুবিধা এবং অন্যান্য তথ্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। এই তথ্যগুলো আপনার ভ্রমণ পরিকল্পনাকে আরও সহজ এবং সুষ্ঠু করবে। যাত্রার আগে একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী জানা থাকলে আপনার সময় এবং অর্থ দুটোই বাঁচবে।
একতা এক্সপ্রেসের পরিচিতি
একতা এক্সপ্রেস (ট্রেন নম্বর ৭০৫/৭০৬) বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি প্রিমিয়াম আন্তঃনগর ট্রেন। এটি ১৯৮৬ সালে প্রথম চালু হয়, তখন এটি ঢাকা থেকে দিনাজপুর পর্যন্ত চলত। ২০১৮ সালে এর রুট পঞ্চগড় পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। বর্তমানে এটি ব্রডগেজ রেলপথে চলে, এবং এর আধুনিক কোচগুলো যাত্রীদের জন্য আরামদায়ক। ট্রেনটিতে মোট ১২টি কোচ রয়েছে, যার মধ্যে এসি চেয়ার, এসি বার্থ, শোভন চেয়ার এবং খাবারের কোচ অন্তর্ভুক্ত। এই ট্রেনটি প্রতিদিন চলে, এবং এর কোনো সাপ্তাহিক ছুটি নেই।
আরও জানতে পারেনঃ চিলাহাটি ট্রেনের সময়সূচী ও ভাড়ার তালিকা
ইতিহাস এবং উন্নয়ন
একতা এক্সপ্রেস প্রথম চালু হয় ১৯৮৬ সালে, তখন এটি মিটার গেজ রেলপথে চলত। ২০১৬ সালে ব্রডগেজে রূপান্তরিত হয়, এবং ২০১৮ সালে পঞ্চগড় পর্যন্ত রুট বাড়ানো হয়। এই উন্নয়নের ফলে ট্রেনটি আরও দ্রুত এবং নিরাপদ হয়েছে। আধুনিক কোচগুলো ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা, যা যাত্রীদের আরাম দেয়।
একতা এক্সপ্রেসের রুট এবং স্টপেজ
একতা এক্সপ্রেস ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পঞ্চগড়ের বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম স্টেশন পর্যন্ত যায়। এই রুটে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দূরত্ব, এবং এটি ১৮টি প্রধান স্টেশনে থামে। নিচে প্রধান স্টপেজগুলোর তালিকা দেওয়া হলো:
- কমলাপুর (ঢাকা)
- বিমানবন্দর
- জয়দেবপুর
- টাঙ্গাইল
- বাঙ্গাবন্ধু সেতু পূর্ব
- সিরাজগঞ্জ বাজার
- উল্লাপাড়া
- ঈশ্বরদী বাইপাস
- নাটোর
- সান্তাহার
- আক্কেলপুর
- জয়পুরহাট
- পাঁচবিবি
- বিরামপুর
- ফুলবাড়ী
- পার্বতীপুর
- দিনাজপুর
- পঞ্চগড়
প্রতিটি স্টেশনে থামার সময় ২-৫ মিনিট। এই স্টপেজগুলো যাত্রীদের জন্য সুবিধাজনক।
যাত্রার সময় এবং দূরত্ব
এই রুটে যাত্রা সময় লাগে প্রায় ১০ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। উত্তরাঞ্চলের সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য, যেমন নদী, পাহাড় এবং সবুজ ক্ষেত, যাত্রীদের জন্য আকর্ষণীয়।
একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী ২০২৫
একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী নিয়মিত আপডেট করা হয়। ২০২৫ সালের সর্বশেষ সময়সূচী নিচে টেবিলে দেওয়া হলো:
| ট্রেন নম্বর | রুট | ছাড়ার সময় | পৌঁছানোর সময় | যাত্রার সময় | ছুটির দিন |
|---|---|---|---|---|---|
| ৭০৫ | ঢাকা থেকে পঞ্চগড় | ১০:১৫ AM | ৯:০০ PM | ১০ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট | নেই |
| ৭০৬ | পঞ্চগড় থেকে ঢাকা | ৯:১০ PM | ৭:৫০ AM | ১০ ঘণ্টা ৪০ মিনিট | নেই |
ঢাকা থেকে পঞ্চগড় (ট্রেন নম্বর ৭০৫)
| স্টেশন নাম | পৌঁছানোর সময় | ছাড়ার সময় |
|---|---|---|
| কমলাপুর (ঢাকা) | – | ১০:১৫ AM |
| বিমানবন্দর | ১০:৩৮ AM | ১০:৪৩ AM |
| জয়দেবপুর | ১১:০০ AM | ১১:০৯ AM |
| নাটোর | ২:৫৩ PM | ২:৫৭ PM |
| দিনাজপুর | ৭:০০ PM | ৭:০৫ PM |
| পঞ্চগড় | ৯:০০ PM | – |
পঞ্চগড় থেকে ঢাকা (ট্রেন নম্বর ৭০৬)
| স্টেশন নাম | পৌঁছানোর সময় | ছাড়ার সময় |
|---|---|---|
| পঞ্চগড় | – | ৯:১০ PM |
| দিনাজপুর | ১১:০৫ PM | ১১:১৩ PM |
| সান্তাহার | ১:৫৫ AM | ২:০০ AM |
| নাটোর | ২:৪১ AM | ২:৪৪ AM |
| জয়দেবপুর | ৬:১৪ AM | ৬:২১ AM |
| কমলাপুর (ঢাকা) | ৭:৫০ AM | – |
সময়সূচী পরিবর্তন হতে পারে, তাই বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট চেক করুন।
একতা এক্সপ্রেসের টিকেট মূল্য
একতা এক্সপ্রেসে বিভিন্ন শ্রেণির আসন রয়েছে, যা সব ধরনের যাত্রীদের জন্য উপযুক্ত। ঢাকা থেকে পঞ্চগড়ের ভাড়া (১৫% ভ্যাটসহ):
| আসনের ধরন | মূল্য (টাকা) |
|---|---|
| শোভন | ৪৫০ |
| শোভন চেয়ার | ৭৬০ |
| প্রথম শ্রেণী সিট | ৮৫০ |
| প্রথম শ্রেণী বার্থ | ১০৫০ |
| এসি চেয়ার | ১৪২০ |
| এসি বার্থ | ১৭০০ |
মধ্যবর্তী স্টেশনের ভাড়া
| স্টেশন | শোভন চেয়ার | এসি চেয়ার |
|---|---|---|
| নাটোর | ৩৫০ | ৬৫০ |
| দিনাজপুর | ৫৫০ | ১০৫০ |
| পঞ্চগড় | ৭৬০ | ১৪২০ |
টিকেট মূল্য পরিবর্তন হতে পারে, তাই কেনার সময় যাচাই করুন।
একতা এক্সপ্রেসের সুবিধাসমূহ
একতা এক্সপ্রেস যাত্রীদের জন্য আধুনিক সুবিধা প্রদান করে। নিচে প্রধান সুবিধাগুলোর তালিকা:
- আরামদায়ক আসন: শোভন চেয়ার, এসি চেয়ার এবং এসি বার্থ বিভিন্ন বাজেটের জন্য।
- খাবার সুবিধা: খাবারের কোচে চা, কফি, নাস্তা এবং ভারী খাবার পাওয়া যায়।
- নিরাপত্তা: রেলওয়ে পুলিশ এবং সিসিটিভি নজরদারি।
- পরিষ্কার টয়লেট: আধুনিক টয়লেট সিস্টেম।
- প্রার্থনার স্থান: মুসলিম যাত্রীদের জন্য নামাজের জায়গা।
- লাগেজ সুবিধা: নির্দিষ্ট ওজন পর্যন্ত ফ্রি লাগেজ (এসি যাত্রীদের জন্য ৫৬ কেজি)।
এই সুবিধাগুলো যাত্রাকে আরামদায়ক এবং নিরাপদ করে।
কেন একতা এক্সপ্রেস বেছে নেবেন?
একতা এক্সপ্রেস বেছে নেওয়ার কারণ:
- সাশ্রয়ী মূল্য: বাসের তুলনায় কম খরচে ভ্রমণ।
- ট্রাফিকমুক্ত: ট্রাফিক জ্যাম ছাড়াই দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছায়।
- আরামদায়ক: আধুনিক কোচ এবং পরিষ্কার পরিবেশ।
- নির্ভরযোগ্য: সাধারণত সময়মতো চলে।
এটি উত্তরাঞ্চলের ব্যবসায়ী, পর্যটক এবং সাধারণ যাত্রীদের জন্য আদর্শ।
টিকেট কেনার উপায়
টিকেট কেনার জন্য:
- অনলাইন: eticket.railway.gov.bd থেকে রেজিস্টার করে টিকেট কিনুন। ভিসা, মাস্টারকার্ড বা বিকাশের মাধ্যমে পেমেন্ট।
- কাউন্টার: কমলাপুর বা অন্য স্টেশন থেকে।
- মোবাইল অ্যাপ: রেলওয়ের অ্যাপ ব্যবহার করুন।
টিপস: ছুটির সময় অগ্রিম টিকেট কিনুন। আইডি কার্ড সঙ্গে রাখুন।
ট্রেন ট্র্যাকিং
ট্রেনের অবস্থান জানতে “TR 705” বা “TR 706” লিখে ১৬৩১৮ নম্বরে এসএমএস পাঠান। এটি রিয়েল-টাইম তথ্য দেয়।
যাত্রার জন্য টিপস
- স্টেশনে ৩০ মিনিট আগে পৌঁছান।
- লাগেজের ওজন চেক করুন, অতিরিক্ত হলে চার্জ লাগবে।
- নিজের খাবার নিয়ে যান, যদিও ট্রেনে পাওয়া যায়।
- স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাস্ক এবং স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন।
- বিলম্ব হলে ধৈর্য ধরুন।
একতা এক্সপ্রেসের গুরুত্ব
একতা এক্সপ্রেস উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি ব্যবসায়ীদের জন্য সংযোগ স্থাপন করে এবং পর্যটকদের পঞ্চগড়ের দর্শনীয় স্থান দেখার সুযোগ দেয়। বাংলাদেশের রেলওয়ে ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রতীক এই ট্রেন।
আরও জানতে পারেনঃ চিলাহাটি ট্রেনের সময়সূচী ও ভাড়ার তালিকা
সচরাচর প্রশ্ন (FAQ)
একতা এক্সপ্রেস কি প্রতিদিন চলে?
হ্যাঁ, কোনো ছুটি নেই।
টিকেট কতদিন আগে কেনা যায়?
১০ দিন অগ্রিম।
ট্রেনের অবস্থান কীভাবে জানব?
“TR 705” বা “TR 706” লিখে ১৬৩১৮ নম্বরে এসএমএস করুন।
টিকেট বাতিলে রিফান্ড কীভাবে?
অনলাইনে বা কাউন্টারে।
শিশুদের ভাড়া কত?
৫ বছরের নিচে ফ্রি, তার উপর ছাড়।
শেষ কথা
একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী এবং অন্যান্য তথ্য জানা আপনার ভ্রমণকে আরও সহজ করবে। এটি সাশ্রয়ী, নিরাপদ এবং আরামদায়ক। উত্তরাঞ্চলের যাত্রীদের জন্য এটি একটি আদর্শ বিকল্প। আপনার পরবর্তী ভ্রমণে এই ট্রেন বেছে নিন এবং একটি আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা উপভোগ করুন।