তক্ষক এর দাম কত ২০২৫

তক্ষক এর দাম কত জানেন কি? তক্ষক, একটি বিরল ও আলোচিত সরীসৃপ, বাংলাদেশে এর দাম নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে। টিকটিকির মতো দেখতে এই প্রাণীটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলে পাওয়া যায়। এর ইংরেজি নাম Tokay Gecko এবং বৈজ্ঞানিক নাম Gekko gecko। তবে এর দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে নানা গুজব ও বিভ্রান্তি রয়েছে। কেউ বলে একটি তক্ষকের দাম কোটি টাকা, আবার কেউ বলে এটি প্রায় মূল্যহীন। এই আর্টিকেলে আমরা তক্ষক এর দাম কত , এর চাহিদার কারণ, আইনি দিক এবং সত্যতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

তক্ষক কী?

তক্ষক একটি নিশাচর সরীসৃপ, যা গেকোনিডি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। এর শরীর ধূসর, নীলচে-ধূসর বা বেগুনি-ধূসর রঙের হয়, যার উপর লাল বা সাদাটে ফোঁটা থাকে। এরা সাধারণত ৩০-৩৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, যার মধ্যে লেজের দৈর্ঘ্য প্রায় অর্ধেক। তক্ষকের ডাক ‘তক-ক্কা’ বা ‘কক্কক’ শব্দের মতো, যা থেকে এর নাম এসেছে। এরা কীটপতঙ্গ, ছোট ইঁদুর, টিকটিকি এবং ছোট পাখি খায়। বাংলাদেশে এরা পাহাড়ি অঞ্চল যেমন রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবানে বেশি দেখা যায়। এদের দৃষ্টিশক্তি অত্যন্ত প্রখর, এমনকি আল্ট্রা-ভায়োলেট রশ্মিতেও দেখতে পায়।

তক্ষকের শরীরের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর লেজ। বিপদের সময় এরা লেজ ছুঁড়ে ফেলে আত্মরক্ষা করে, যা পরে আবার গজায়। এই প্রাণীটি পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে রঙ পরিবর্তন করতে পারে, যা এটিকে শিকারীদের থেকে রক্ষা করে। তবে এর দাম নিয়ে যে আলোচনা হয়, তা মূলত গুজব ও অপপ্রচারের ফল।

তক্ষক এর দাম কত ২০২৫: বাংলাদেশের বাজার

২০২৫ সালে বাংলাদেশে তক্ষকের দাম নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া কঠিন, কারণ এটি একটি বন্যপ্রাণী এবং এর ক্রয়-বিক্রয় বাংলাদেশে অবৈধ। তবে বিভিন্ন সূত্র এবং গুজবের ভিত্তিতে দাম নিয়ে আলোচনা হয়। নিচে ২০২৫ সালের সম্ভাব্য দামের একটি ধারণা দেওয়া হলো:

তক্ষকের ধরন

ওজন/আকার

কথিত দাম (টাকা)

উৎস/বাজার

সাধারণ তক্ষক

১৫০-২৫০ গ্রাম

৫,০০০ – ৫০,০০০

স্থানীয় অবৈধ বাজার

বড় তক্ষক

৩০০ গ্রাম বা বেশি

১-৫ লাখ

আন্তর্জাতিক চোরাচালান

হাঁস পা তক্ষক

১৩-১৭ ইঞ্চি

১০ লাখ – কোটি (গুজব)

কোনো নির্ভরযোগ্য বাজার নেই

দ্রষ্টব্য: এই দামগুলো মূলত গুজব ও সিন্ডিকেটের তথ্যের উপর ভিত্তি করে। বাংলাদেশে তক্ষকের কোনো আইনি বাজার নেই। কিছু সূত্রে বলা হয়, ৩০০ গ্রামের একটি তক্ষকের দাম ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ২৪ কোটি টাকা) হতে পারে। তবে এর কোনো বৈজ্ঞানিক বা আইনি ভিত্তি নেই।

কেন এত দামি বলে গুজব?

তক্ষকের উচ্চ দামের পিছনে প্রধানত চারটি কারণ উল্লেখ করা হয়, যদিও এগুলোর বেশিরভাগই লোকমুখে প্রচলিত এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়:

  1. ঔষধি গুণের গুজব: ধারণা করা হয়, তক্ষকের জিহ্বা ও রক্ত দিয়ে এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধী ওষুধ তৈরি হয়। এছাড়া ক্যান্সার ও টিউমার প্রতিরোধে এর শরীরের অংশ ব্যবহৃত হয় বলে গুজব রয়েছে। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।

  2. চীনা ওষুধে ব্যবহার: চীন ও ভিয়েতনামে তক্ষক দিয়ে ঐতিহ্যবাহী ওষুধ তৈরি হয় বলে দাবি করা হয়, যা কিডনি ও ফুসফুসের জন্য উপকারী। এটিও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়।

  3. সৌভাগ্য ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাস: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তক্ষককে সৌভাগ্য ও উর্বরতার প্রতীক মনে করা হয়। কেউ কেউ এটিকে ড্রাগনের সাথে তুলনা করে। এই বিশ্বাস চাহিদা বাড়ায়।

  4. অবৈধ চোরাচালান: তক্ষকের অবৈধ বাণিজ্য আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলে, যারা এর দাম ফুলিয়ে প্রচার করে। এটি লাভজনক ব্যবসার অংশ।

তক্ষকের দামের সত্যতা

বাংলাদেশে তক্ষকের দাম নিয়ে যে কোটি টাকার কথা বলা হয়, তা বেশিরভাগই গুজব। ২০১৬ সালে জগন্নাথপুর টুয়েন্টি ফোরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, তক্ষকের দাম কোটি টাকা বলে প্রচারণা একটি চক্রের ধাপ্পাবাজি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. বিধান চন্দ্র দাস জানান, এই প্রাণীটির বাণিজ্যিক মূল্য নেই, এবং এর উচ্চ দামের গুজব সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করার জন্য ছড়ানো হয়।

ফরিদপুরের বন কর্মকর্তা শেখ লিটন বলেন, তক্ষক একটি নিরীহ বন্যপ্রাণী, যা আইইউসিএন-এর লাল তালিকায় বিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত। এর দাম নিয়ে গুজবের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে অবৈধ বাজারে, বিশেষ করে চীন বা ভারতে, তক্ষকের কথিত দাম লাখ টাকা থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত বলা হয়। এই দামগুলো প্রায়শই সিন্ডিকেটের কৌশল, যারা লোভ দেখিয়ে মানুষকে প্রতারণা করে।

তক্ষকের বাজার ও চাহিদা

২০২৫ সালে বাংলাদেশে তক্ষকের কোনো আইনি বাজার নেই। এটি বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী সংরক্ষিত প্রাণী। তক্ষক ধরা, সংগ্রহ বা বিক্রি করলে ৪০,০০০ টাকা জরিমানা বা কারাদণ্ড হতে পারে। তবে অবৈধভাবে কিছু এলাকায়, যেমন রাঙ্গামাটি বা চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে, তক্ষকের বিক্রি হয়। এই বাজারে দাম নির্ভর করে প্রাণীর ওজন, আকার এবং ক্রেতার উপর।

আন্তর্জাতিক বাজারে, বিশেষ করে চীন, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় তক্ষকের চাহিদা রয়েছে। কিছু সূত্রে বলা হয়, ১৭ ইঞ্চির একটি তক্ষকের দাম ১০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে, তবে এটি অবাস্তব। এই চাহিদার পিছনে প্রধানত ঐতিহ্যবাহী ওষুধ ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাস কাজ করে।

তক্ষক কেনার ঝুঁকি

তক্ষক কেনা বা বিক্রি একটি আইনি অপরাধ। এছাড়া, এর দাম নিয়ে গুজবের কারণে অনেকে প্রতারিত হয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, পিরোজপুরের এক ব্যক্তি ৫ লাখ টাকা দিয়ে তক্ষক কিনতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন। চট্টগ্রামের আরেক ব্যক্তি তক্ষক বিক্রির জন্য সিন্ডিকেটের হাতে মারধর ও লুটপাটের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায়, তক্ষকের ব্যবসা একটি প্রতারণার ফাঁদ।

আইনি শাস্তি

বাংলাদেশে তক্ষক ধরা বা বিক্রির জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা ও কারাদণ্ড দিতে পারে। ২০১৭ সালে মৌলভীবাজারে তিনজনকে তক্ষক সংগ্রহের অভিযোগে ৪০,০০০ টাকা জরিমানা করা হয়। ২০২০ সালে বরগুনায় তিনটি তক্ষকসহ একজনকে আটক করা হয়, যার কথিত মূল্য ছিল সাড়ে ৩ কোটি টাকা। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, তক্ষকের ব্যবসা শুধু অবৈধই নয়, ঝুঁকিপূর্ণও।

তক্ষকের পরিবেশগত গুরুত্ব

তক্ষক একটি উপকারী প্রাণী, যা কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে অতিরিক্ত শিকার ও গুজবের কারণে এরা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। আইইউসিএন-এর লাল তালিকায় তক্ষক বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত। তাই এদের সংরক্ষণের জন্য সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

তক্ষক চেনার উপায়

আসল তক্ষক চেনার জন্য নিচের বিষয়গুলো লক্ষ্য করুন:

  • শারীরিক বৈশিষ্ট্য: তক্ষকের শরীরে লাল বা সাদাটে ফোঁটা থাকে, এবং এরা রঙ পরিবর্তন করতে পারে।

  • ডাক: ‘তক-ক্কা’ শব্দ, যা রাতে শোনা যায়।

  • লেজ: লেজে নীল ও সাদা রঙের বলয় থাকে, এবং বিপদে লেজ ছুঁড়ে ফেলে।

  • আকার: সাধারণত ৩০-৩৫ সেন্টিমিটার, তবে বড় তক্ষক ৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

নকল তক্ষক বা অন্য প্রাণীকে তক্ষক বলে বিক্রির চেষ্টা হতে পারে, তাই সতর্ক থাকুন।

তক্ষক কোথায় পাওয়া যায়?

বাংলাদেশে তক্ষক প্রধানত পাহাড়ি এলাকায়, যেমন চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে পাওয়া যায়। এরা পুরানো বাড়ির দেয়াল, গাছের ফাঁক বা জঙ্গলে বাস করে। তবে এদের ধরা বা সংগ্রহ করা সম্পূর্ণ অবৈধ।

আরও জানতে পারেনঃ রেবিস ভ্যাকসিন এর দাম বাংলাদেশে ২০২৫

তক্ষকের বিকল্প ব্যবহার

যদিও তক্ষকের ঔষধি গুণ নিয়ে গুজব রয়েছে, বৈজ্ঞানিকভাবে এটি প্রমাণিত নয়। তবে এরা পোষা প্রাণী হিসেবে কিছু দেশে জনপ্রিয়। তবে বাংলাদেশে এটি অবৈধ। পরিবর্তে, পরিবেশ সংরক্ষণে তক্ষকের ভূমিকাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

সতর্কতা ও পরামর্শ

  • আইন মানুন: তক্ষক ধরা বা বিক্রি করবেন না, এটি আইনি অপরাধ।

  • প্রতারণা এড়ান: কোটি টাকার লোভে প্রতারিত হবেন না। কোনো নির্ভরযোগ্য বাজার নেই।

  • সচেতনতা বাড়ান: তক্ষক সংরক্ষণে স্থানীয় সম্প্রদায়কে উৎসাহিত করুন।

  • পরিবেশ রক্ষা: তক্ষকের পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা ছড়ান।

শেষ কথা

২০২৫ সালে বাংলাদেশে তক্ষকের দাম নিয়ে যে আলোচনা হয়, তা মূলত গুজব ও অপপ্রচারের ফল। সাধারণ তক্ষকের দাম স্থানীয় অবৈধ বাজারে ৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা হতে পারে, তবে বড় তক্ষকের জন্য কোটি টাকার কথা বলা হয়, যা বাস্তবসম্মত নয়। এই প্রাণীটি বন্যপ্রাণী হিসেবে সংরক্ষিত, এবং এর ক্রয়-বিক্রয় অবৈধ। তাই তক্ষকের লোভে প্রতারিত হওয়ার পরিবর্তে, এর পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হোন। আরও জানতে কমেন্ট করুন এবং আমাদের সাথে থাকুন!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top