ঢাকা থেকে খুলনা ট্রেনের সময়সূচী

ঢাকা থেকে খুলনা ট্রেনের সময়সূচী সম্পর্কে জানতে চান? বাংলাদেশের রেলপথ একটি অপরিহার্য যাতায়াত ব্যবস্থা, যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে একত্রিত করে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা শহরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে ট্রেনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খুলনা বাংলাদেশের একটি প্রধান শিল্নগ্রাম, যেখানে সুন্দরবনের সৌন্দর্য, শিল্পকারখানা এবং ঐতিহাসিক স্থানগুলো অপেক্ষমাণ। ঢাকা থেকে খুলনায় দূরত্ব প্রায় ২৭২ কিলোমিটার, এবং ট্রেনের মাধ্যমে এই যাত্রা সহজ, আরামদায়ক এবং অর্থনৈতিক। বাংলাদেশ রেলওয়ে এই রুটে কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেন পরিচালনা করে, যা যাত্রীদের বিভিন্ন শ্রেণির আসন এবং সুবিধা প্রদান করে।

এই যাত্রা শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং দেশের সবুজ মাঠ, নদী এবং গ্রামীণ জীবনের এক চিত্রকল্প। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের পর এই রুটে যাত্রা সময় অনেক কমে গেছে, যা যাত্রীদের জন্য একটি বড় স্বস্তি। যদি আপনি ব্যবসায়িক কাজ, পরিবারের সাথে ভ্রমণ বা শিক্ষার উদ্দেশ্যে খুলনা যেতে চান, তাহলে ট্রেনের পছন্দ সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত। এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব ঢাকা থেকে খুলনা ট্রেনের সময়সূচী, ভাড়া, টিকিট বুকিং প্রক্রিয়া এবং অন্যান্য দরকারি তথ্য নিয়ে। এই তথ্যগুলো বাংলাদেশ রেলওয়ের সরকারি সূত্র থেকে সংগ্রহিত, যাতে আপনার যাত্রা নিরাপদ এবং সুষ্ঠু হয়।

খুলনা শহরের ঐতিহাসিক গুরুত্বও উল্লেখযোগ্য। এখানকার শিল্পাঞ্চল দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে, এবং সুন্দরবনের কাছাকাছি অবস্থান এটিকে পর্যটনের কেন্দ্র করে তুলেছে। ট্রেন যাত্রা করে এই স্থানগুলো পরিদর্শন করা এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশ রেলওয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই রুটে সেবা প্রদান করে আসছে, এবং সাম্প্রতিক উন্নয়নগুলো যাত্রীদের আরও সুবিধা দিয়েছে। এখন আসুন বিস্তারিত আলোচনায়।

ঢাকা থেকে খুলনা ট্রেনের সময়সূচী: বিস্তারিত তথ্য

ঢাকা থেকে খুলনায় যাতায়াতের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রধানত তিনটি আন্তঃনগর ট্রেন পরিচালনা করে। এগুলো হলো সুন্দরবন এক্সপ্রেস, চিত্রা এক্সপ্রেস এবং সাম্প্রতিককালে চালু হয়েছে জাহানাবাদ এক্সপ্রেস। এই ট্রেনগুলো কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে খুলনা রেলস্টেশন পর্যন্ত যায়। সময়সূচীতে পরিবর্তন হতে পারে, তাই যাত্রার আগে অফিসিয়াল ওয়েবসাইট চেক করুন। নিচে ২০২৫ সালের সর্বশেষ সময়সূচী অনুযায়ী বিবরণ দেওয়া হলো।

১. সুন্দরবন এক্সপ্রেস (ট্রেন নম্বর ৭২৬)

এটি ঢাকা-খুলনা রুটের সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্রেন, যা ২০০৩ সাল থেকে চলছে। পদ্মা সেতুর পর এর যাত্রা সময় কমে সাড়ে ৭ ঘণ্টায় নেমে এসেছে।

  • যাত্রা সময়: সকাল ৮:০০ টায় কমলাপুর থেকে ছাড়ে।
  • প্রাকমিক টানা: বিকাল ৩:৪০ মিনিটে খুলনায় পৌঁছায়।
  • যাত্রা সময়কাল: প্রায় ৭ ঘণ্টা ৪০ মিনিট।
  • সাপ্তাহিক ছুটি: বুধবার।
  • প্রধান স্টপেজ: বিমানবন্দর, জয়দেবপুর, মিরজাপুর, টাঙ্গাইল, ইশুরদি, পোড়াদহ, চুয়াডাঙ্গা, যশোর। মোট ১৯টি স্টপ।
  • ফেরার সময়সূচী: খুলনা থেকে রাত ৯:৪৫ মিনিটে ছাড়ে, সকাল ৫:১০ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছায়।

এই ট্রেনটি আরামদায়ক এবং দ্রুতগতির, যাতে এসি কেবিন এবং শোবন চেয়ার রয়েছে। যাত্রীদের মতে, এটি দিনের যাত্রার জন্য আদর্শ।

২. চিত্রা এক্সপ্রেস (ট্রেন নম্বর ৭৩১)

চিত্রা নদের নামে নামকরণ করা এই ট্রেনটি ২০১৫ সালে চালু হয়েছে। এটি রাতের যাত্রার জন্য উপযোগী।

  • যাত্রা সময়: সন্ধ্যা ৭:০০ টায় কমলাপুর থেকে ছাড়ে।
  • প্রাকমিক টানা: ভোর ৩:১০ মিনিটে খুলনায় পৌঁছায়।
  • যাত্রা সময়কাল: প্রায় ৮ ঘণ্টা ১০ মিনিট।
  • সাপ্তাহিক ছুটি: সোমবার।
  • প্রধান স্টপেজ: বিমানবন্দর, জয়দেবপুর, টাঙ্গাইল, ইশুরদি, পোড়াদহ, যশোর। মোট ১৪টি স্টপ।
  • ফেরার সময়সূচী: খুলনা থেকে সকাল ৯:০০ টায় ছাড়ে, বিকেল ৫:৫৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছায়।

এই ট্রেনে স্লিপার কোচ রয়েছে, যা রাতের যাত্রায় বিশ্রামের সুবিধা দেয়। যমুনা সেতুর সময় এটি ৯ ঘণ্টারও বেশি সময় নিত, কিন্তু এখন পদ্মা সেতু এটিকে দ্রুত করেছে।

৩. জাহানাবাদ এক্সপ্রেস (ট্রেন নম্বর ৭১৫/৭১৬)

পদ্মা সেতুর নতুন রুটে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে চালু হয়েছে এই ট্রেন, যা যাত্রা সময় আরও কমিয়ে দিয়েছে। এটি নড়াইল-যশোর হয়ে যায়।

  • যাত্রা সময়: সকাল ৬:২০ টায় কমলাপুর থেকে ছাড়ে।
  • প্রাকমিক টানা: দুপুর ১০:০৫ মিনিটে খুলনায় পৌঁছায় (প্রায় ৩ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট)।
  • সাপ্তাহিক ছুটি: শুক্রবার।
  • প্রধান স্টপেজ: গেন্ডারিয়া, মাওয়া, পদ্মা সেতু, যশোর। কম স্টপ, তাই দ্রুত।
  • ফেরার সময়সূচী: খুলনা থেকে সকাল ৬:০০ টায় ছাড়ে, সকাল ৯:৪৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছায়।

এই ট্রেনটি বিমানের মতো দ্রুত, এবং ভাড়াও কম। দূরত্ব ২১২ কিমি কমে গেছে এই নতুন পথে।

ঢাকা থেকে খুলনা ট্রেনের সময়সূচী এই তিনটি ট্রেনের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত, যা যাত্রীদের বিভিন্ন সময়ে অপশন দেয়। সকালের ট্রেন দিনের ভ্রমণের জন্য ভালো, আর রাতের ট্রেন অফিস-কর্মীদের জন্য উপযোগী। বাংলাদেশ রেলওয়ে সময়সূচীতে মাঝে মাঝে পরিবর্তন আনে, বিশেষ করে ছুটির দিন বা জরুরি কারণে। তাই যাত্রার ৭২ ঘণ্টা আগে চেক করুন। এই রুটে ট্রেনগুলো পদ্মা সেতু হয়ে চলে, যা যাত্রাকে আরও মজাদার করে তোলে। সেতুর উপর দিয়ে যাওয়া একটি অসাধারণ দৃশ্য, যেখানে নদীর সৌন্দর্য চোখে পড়ে।

ট্রেন ভাড়া: শ্রেণী অনুসারে বিস্তারিত

ট্রেন ভাড়া অর্থনৈতিক, যা বাসের তুলনায় কম এবং বিমানের চেয়ে সস্তা। ভাড়া শ্রেণীভিত্তিক, এবং ২০২৫ সালের হার অনুযায়ী নিচে তালিকাভুক্ত করা হলো (ঢাকা থেকে খুলনা পুরো যাত্রার জন্য)। এগুলো বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিসিয়াল হার।

শ্রেণী সুন্দরবন এক্সপ্রেস চিত্রা এক্সপ্রেস জাহানাবাদ এক্সপ্রেস
শোবন চেয়ার ৪৪৫ টাকা ৪৪৫ টাকা ৫৫০ টাকা
এসি চেয়ার ৭৮৫ টাকা ৭৮৫ টাকা ৯৫০ টাকা
এসি কেবিন ১১৯০ টাকা ১১৯০ টাকা ১৪৫০ টাকা
এসি বার্থ ১৪৬৫ টাকা ১৪৬৫ টাকা ১৭৫০ টাকা
প্রিমিয়াম ২১৬৮ টাকা ২১৬৮ টাকা ২৫০০ টাকা

ভাড়ায় ১৫% ছাড় পাওয়া যায় যদি টিকিট ২২ দিন আগে কাটা হয়। শিশু এবং সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য বিশেষ ছাড় রয়েছে। এই ভাড়া সুন্দরবন এক্সপ্রেসের মতো ট্রেনে বেশি চাহিদা থাকে, তাই আগে বুক করুন। জাহানাবাদ এক্সপ্রেসের ভাড়া কিছুটা বেশি কারণ এটি দ্রুত।

টিকিট বুকিং: অনলাইন এবং অফলাইন প্রক্রিয়া

বাংলাদেশ রেলওয়ে ই-টিকেটিং সিস্টেম চালু করে টিকিট কাটা সহজ করেছে। যাত্রার ৭২ ঘণ্টা আগে থেকে ৩০ মিনিট আগে পর্যন্ত বুক করা যায়।

অনলাইন বুকিং

  • ওয়েবসাইট: eticket.railway.gov.bd-এ যান।
  • অ্যাপ: রেল শেবা অ্যাপ ডাউনলোড করুন (অ্যান্ড্রয়েড/আইওএস)।
  • পদক্ষেপ: রুট সিলেক্ট করুন (ঢাকা-খুলনা), তারিখ চয়ন করুন, শ্রেণী বেছে নিন, পেমেন্ট করুন (বিকাশ, নগদ, কার্ড)।
  • পাসওয়ার্ড: প্রথমবার রেজিস্ট্রেশন করুন, তারপর টিকিট প্রিন্ট বা মোবাইলে দেখান।

অফলাইন বুকিং

  • কমলাপুর বা খুলনা স্টেশনে কাউন্টারে যান।
  • আইডি (ভোটার আইডি/জন্ম সনদ) দেখিয়ে টিকিট কিনুন।
  • এজেন্টদের মাধ্যমেও সম্ভব, কিন্তু অতিরিক্ত ফি লাগে।

অনলাইন বুকিংয়ে কোনো লাইন দাঁড়াতে হয় না, এবং রিফান্ড সুবিধা রয়েছে। ব্যস্ত দিনে (ঈদ, পূজা) আগে বুক করুন।

ট্রেন যাত্রার সুবিধা এবং টিপস

বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেনগুলোতে আধুনিক সুবিধা রয়েছে। সুন্দরবন এক্সপ্রেসে এসি কেবিনে টিভি, চার্জিং পয়েন্ট এবং খাবার সার্ভিস আছে। চিত্রায় স্লিপারে বিছানা সুবিধা। জাহানাবাদে দ্রুত যাত্রার জন্য কম স্টপ।

যাত্রার টিপস:

  • লাইট প্যাকিং করুন, কারণ স্টেশনে ভিড় হয়।
  • খাবার নিজে নিয়ে যান, কিন্তু স্টেশনে ক্যান্টিন আছে।
  • মাস্ক এবং স্যানিটাইজার রাখুন, বিশেষ করে কোভিডের পর।
  • যাত্রা সময় দেরি হতে পারে বৃষ্টিতে, তাই বাফার টাইম রাখুন।
  • খুলনায় পৌঁছে অটো বা রিকশা নিন, স্টেশন থেকে সেন্ট্রাল বাস ৫ কিমি।

এই ট্রেনগুলো পরিবেশবান্ধব, এবং জ্বালানির খরচ কম। যাত্রা করে আপনি দেশের স্থাপত্য দেখতে পাবেন, যেমন পদ্মা সেতুর সৌন্দর্য।

খুলনা শহরের আকর্ষণীয় স্থানসমূহ

খুলনায় পৌঁছে ভ্রমণ না করলে যাত্রা অসম্পূর্ণ। সুন্দরবনের গেটওয়ে হিসেবে এখানে রয়েছে:

  • সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ: বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখার সুযোগ।
  • শিলাইদহ কুঠিবাড়ি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিস্থল, কবিতার অনুপ্রেরণা।
  • সাগরদইঘি: ঐতিহাসিক দ্বীপ, পিকনিক স্পট।
  • খুলনা শিল্পাঞ্চল: জুট মিলগুলোর ইতিহাস জানুন।

এই স্থানগুলো ট্রেন যাত্রার পর পরিদর্শন করলে আনন্দ দ্বিগুণ। শহরে হোটেল এবং রেস্টুরেন্টের অভাব নেই, যেমন হাওড়া রিভারের পাড়ে খাবার।

আরও জানতে পারেনঃ ঢাকা থেকে সিলেট ট্রেনের সময়সূচী

শেষ কথা

ঢাকা থেকে খুলনা ট্রেন যাত্রা একটি সুন্দর অভিজ্ঞতা, যা সময়সূচী এবং ভাড়ার সঙ্গে সহজ। বাংলাদেশ রেলওয়ে এই সেবা উন্নত করে চলেছে, এবং পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্প দেশের যোগাযোগকে শক্তিশালী করেছে। যাত্রার আগে অফিসিয়াল সূত্র চেক করুন, এবং নিরাপত্তা মেনে চলুন। এই গাইড আপনার যাত্রাকে সহজ করুক। খুলনার সৌন্দর্য উপভোগ করুন, এবং নিরাপদে ফিরে আসুন। যদি আরও কোনো প্রশ্ন থাকে, রেলওয়ের হেল্পলাইন ১৬২২-এ কল করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top