ঢাকা থেকে সিলেট ট্রেনের সময়সূচী

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে সিলেটের সবুজ পাহাড়ি এলাকায় যাত্রা করা সবসময়ই এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। সিলেট, যাকে প্রকৃতির কন্যা বলা হয়, তার চা বাগান, জাফলং, রাতারগুলের মতো দৃশ্যমান সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক, ব্যবসায়ী এবং পরিবারের সদস্যরা এই রুটে যাতায়াত করেন। ট্রেন ভ্রমণ এখানে সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম, কারণ এটি আরামদায়ক, সাশ্রয়ী এবং সময়োপযোগী। সড়ক পথে যাত্রা করলে যে যানজট বা দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে, ট্রেনে তা অনেক কম। এছাড়া, ট্রেনের জানালা দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদী, সবুজ মাঠ এবং গ্রামীণ জীবনের ছবি দেখে যাত্রা আরও আনন্দময় হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের এই রুটে যাত্রা করার আগে কিছু মৌলিক তথ্য জানা জরুরি। ঢাকা থেকে সিলেটের দূরত্ব প্রায় ২৩৫ কিলোমিটার, এবং যাত্রার সময় সাধারণত ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা লাগে, ট্রেনের ধরন অনুসারে। বছরের শেষের দিকে বা ছুটির সময় টিকিটের চাহিদা বাড়ে, তাই আগাম বুকিং করা স্মার্ট সিদ্ধান্ত। সরকারি নিয়ম অনুসারে, টিকিট অনলাইনে বা স্টেশনে কেনা যায়, এবং কোভিড-১৯ এর পর থেকে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই গাইডে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব ট্রেনের সময়সূচী, ভাড়া, বুকিং প্রক্রিয়া এবং ভ্রমণের টিপস নিয়ে, যাতে আপনার যাত্রা সহজসুলভ হয়।

ঢাকা থেকে সিলেট যাত্রার জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ে কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেন চালু রেখেছে, যা দৈনিকভাবে চলে। এই ট্রেনগুলো বিভিন্ন ক্লাসে যাত্রী বহন করে, যেমন শোবন চেয়ার, এসি চেয়ার, এসি স্লিপার এবং ফার্স্ট ক্লাস। রুটটি মূলত কামালাপুর রেলস্টেশন থেকে শুরু হয়ে ভৈরব, ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনা হয়ে সিলেটে পৌঁছায়। কিছু ট্রেন সরাসরি যায়, আবার কিছুতে মাঝপথে থামা হয় যাত্রীদের সুবিধার জন্য। ২০২৫ সালে এই রুটে পাঁচটি প্রধান আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে, এবং একটি মেইল এক্সপ্রেস। এগুলোর মধ্যে পার্বত এক্সপ্রেস, জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস এবং কালানী এক্সপ্রেস সবচেয়ে জনপ্রিয়। এছাড়া সুরমা এক্সপ্রেস মেইল ট্রেন হিসেবে রাতের যাত্রীদের জন্য উপযোগী। সময়সূচীতে সামান্য পরিবর্তন হতে পারে, তাই অফিসিয়াল ওয়েবসাইট চেক করুন।

ঢাকা থেকে সিলেট ট্রেনের সময়সূচী

ঢাকা থেকে সিলেট ট্রেনের সময়সূচী নির্ধারিত এবং নিয়মিত আপডেট করা হয় বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃক। নিচে ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক সময়সূচী দেওয়া হলো, যা অফিসিয়াল সোর্স থেকে সংগ্রহিত। এই সময়সূচী কামালাপুর স্টেশন থেকে ছাড়ার সময় এবং সিলেটে পৌঁছানোর সময় নির্দেশ করে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনও উল্লেখ করা হয়েছে। মনে রাখবেন, আবহাওয়া বা প্রযুক্তিগত সমস্যায় দেরি হতে পারে।

ট্রেনের নাম এবং নম্বর ছাড়ার সময় (কামালাপুর থেকে) পৌঁছানোর সময় (সিলেটে) যাত্রার সময়কাল সাপ্তাহিক ছুটি উপলব্ধ ক্লাস
পার্বত এক্সপ্রেস (৭০৯) সকাল ৭:৩০ দুপুর ১:১৫ ৫ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট বুধবার শোবন চেয়ার, এসি চেয়ার, এসি স্লিপার
জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস (৭১৭) সকাল ৯:১৫ বিকেল ২:৪৫ ৫ ঘণ্টা ৩০ মিনিট শুক্রবার শোবন চেয়ার, এসি চেয়ার
উপবন এক্সপ্রেস (৭৩৯) দুপুর ১২:১৫ সন্ধ্যা ৫:৫০ ৫ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট মঙ্গলবার শোবন চেয়ার, এসি স্লিপার
কালানী এক্সপ্রেস (৭৭৩) বিকেল ৪:৩০ রাত ৯:২০ ৪ ঘণ্টা ৫০ মিনিট বৃহস্পতিবার এসি চেয়ার, ফার্স্ট ক্লাস
সুরমা এক্সপ্রেস (০৯) – মেইল রাত ১০:৫০ সকাল ৫:১০ (পরের দিন) ৬ ঘণ্টা ২০ মিনিট কোনো ছুটি নেই শোবন চেয়ার, এসি স্লিপার, ফার্স্ট ক্লাস

এই ট্রেনগুলোর মধ্যে পার্বত এক্সপ্রেস সবচেয়ে দ্রুত এবং জনপ্রিয়, বিশেষ করে দিনের যাত্রীদের জন্য। রাতের যাত্রার জন্য সুরমা এক্সপ্রেস আদর্শ, কারণ এতে স্লিপার সুবিধা আছে। মাঝপথের স্টপেজগুলোতে খাবারের অ্যারেঞ্জমেন্ট থাকে, যেমন ভৈরব বা ময়মনসিংহে। যদি আপনি পরিবার নিয়ে যান, তাহলে এসি ক্লাস বেছে নিন, যাতে আরাম বজায় থাকে।

সিলেট থেকে ঢাকা ফেরার জন্যও অনুরূপ সময়সূচী আছে, যা উল্টো দিকে। উদাহরণস্বরূপ, পার্বত এক্সপ্রেস সিলেট থেকে সকাল ৮:২২-এ ছাড়ে এবং ঢাকায় দুপুর ২:১০-এ পৌঁছায়। এই তথ্যগুলো ২০২৫ সালের আপডেট অনুসারে, কিন্তু সর্বশেষ চেক করুন।

ট্রেনের ভাড়া ও ক্লাসের বিবরণ

ভাড়া নির্ধারণ করা হয় কিলোমিটার এবং ক্লাসের ভিত্তিতে। ২০২৫ সালে ঢাকা-সিলেট রুটে ভাড়া সামান্য বেড়েছে, কিন্তু এখনও সাশ্রয়ী। শোবন চেয়ার ক্লাসে ভাড়া শুরু হয় ২৫০ টাকা থেকে, যা সাধারণ যাত্রীদের জন্য উপযুক্ত। এসি চেয়ারে ৪৫০-৫৫০ টাকা, এসি স্লিপারে ৬৫০-৭৫০ টাকা এবং ফার্স্ট ক্লাসে ৮০০-৯০০ টাকা। এই ভাড়ায় খাবারের চার্জ অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে ট্রেনে ভেড়ির অ্যারেঞ্জমেন্ট আছে। শিশু এবং সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য ছাড় পাওয়া যায়।

ভাড়ার তালিকা নিচে দেওয়া হলো (প্রায়মান্য, ট্যাক্স সহ):

  • শোবন চেয়ার: ২৫০ টাকা (সকল ট্রেনে উপলব্ধ)
  • এসি চেয়ার: ৪৮০ টাকা (পার্বত, জয়ন্তিকা, কালানী)
  • এসি স্লিপার: ৬৮০ টাকা (উপবন, সুরমা)
  • ফার্স্ট ক্লাস: ৮৫০ টাকা (সুরমা, কালানী)

এই ভাড়া বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিসিয়াল রেট অনুসারে। যদি আপনি গ্রুপে যান, তাহলে প্যাকেজ অফার দেখুন। বাসের তুলনায় ট্রেনের ভাড়া কম, এবং নিরাপত্তা বেশি।

টিকিট বুকিং এর প্রক্রিয়া

টিকিট বুকিং এখন খুব সহজ হয়েছে ডিজিটাল যুগে। বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিসিয়াল অ্যাপ ‘রেলশেডিউল’ বা ওয়েবসাইট railway.gov.bd থেকে অনলাইনে বুক করুন। যাত্রার ৩০ দিন আগে থেকে বুকিং শুরু হয়। প্রক্রিয়া: অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন, ট্রেন সিলেক্ট করুন, আসন বেছে নিন, পেমেন্ট করুন (বিকাশ, নগদ বা কার্ড)। ই-টিকিট মোবাইলে দেখান। স্টেশনে গিয়ে কাউন্টার থেকেও কিনতে পারেন, কিন্তু ভিড়ের সময় অনলাইন ভালো।

যাত্রার দিন স্টেশনে ৩০ মিনিট আগে পৌঁছান। কোভিড প্রোটোকল মেনে মাস্ক পরুন। যদি টিকিট না পান, তাহলে ওয়েটিং লিস্ট চেক করুন বা অল্টারনেটিভ ট্রেন দেখুন। বুকিংয়ের সময় পাসপোর্ট সাইজ ছবি এবং NID দরকার হতে পারে। এই সিস্টেমটি ২০২৫ সালে আরও উন্নত হয়েছে, যাতে ব্ল্যাক মার্কেটিং কমে।

যাত্রার সুবিধা এবং টিপস

ট্রেনে যাত্রা করলে সুবিধাগুলো অনেক। প্রত্যেক কোচে পরিষ্কার টয়লেট, পানি সরবরাহ এবং চার্জিং পয়েন্ট আছে। খাবারের জন্য ভেড়ির সার্ভিস চলে, যাতে বিরিয়ানি, স্যান্ডউইচ বা ফলমূল পাওয়া যায়। এসি কোচে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত, যাতে গরমকালে আরাম হয়। পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কোচ আছে, যেখানে শিশুদের খেলার জায়গা।

কিছু টিপস: লাইট ব্যাগ নিন, কারণ স্টোরেজ সীমিত। জানালার পাশে আসন বেছে নিন দৃশ্য উপভোগের জন্য। মনস্টার বা চুরির থেকে সাবধান থাকুন, মূল্যবান জিনিস আঁটসাট বাঁধুন। বর্ষাকালে যাত্রা করলে রেইনকোট রাখুন। যদি প্রথমবার যান, তাহলে গাইডবুক পড়ুন বা অ্যাপ ডাউনলোড করুন। স্বাস্থ্যের জন্য ওষুধ রাখুন, বিশেষ করে মোশন সিকনেসের জন্য। এই টিপসগুলো অনুসরণ করলে যাত্রা মসৃণ হবে।

সিলেটের আকর্ষণীয় স্থানসমূহ

যাত্রা শেষ করে সিলেটে পৌঁছে আপনি চা বাগানে ঘুরতে পারেন, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় চা উৎপাদনকারী এলাকা। জাফলং-এ পাহাড়ি ঝর্ণা দেখুন, বা রাতারগুলে নৌকা ভ্রমণ করুন। শাহী মসজিদ বা কেয়াকতারা লেকও অবশ্য দেখার। স্থানীয় খাবার যেমন থেরি বা পিঠা চেখে দেখুন। ট্রেন যাত্রা এই সবকিছুর প্রবেশদ্বার।

আরও জানতে পারেনঃ দোলা পরিবহন অনলাইন টিকিট

শেষ কথা

ঢাকা থেকে সিলেট ট্রেন যাত্রা শুধু একটি ভ্রমণ নয়, এটি একটি স্মৃতি। সঠিক সময়সূচী এবং প্রস্তুতি নিলে এটি হবে আপনার সেরা অভিজ্ঞতা। সর্বদা অফিসিয়াল সোর্স চেক করুন এবং দায়িত্বশীলভাবে ভ্রমণ করুন। সিলেটের সবুজে হারিয়ে যান, কিন্তু প্রকৃতি রক্ষা করুন। এই গাইড আপনার যাত্রাকে সহজ করুক। নিরাপদ যাত্রা কামনা করি!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top